
published : ১৬ মার্চ ২০২৬
শিশুসন্তান যখন দুই বছরে পা রাখে তখন হঠাৎ করেই যেন মনে হয় এই বাচ্চাটাকে আমি চিনি না! যে বাচ্চাটা কয়েকদিন আগেও আপনার কোলে-কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাত, সে-ই এখন সামান্য কথায় মেঝেতে গড়াগড়ি করছে, চিৎকার করছে, বোল্ডলি ‘না’ বলতে বলতে আপনাকে ক্লান্ত করে তুলছে।
আপনি হয়ত নিজেকেই প্রশ্ন করছেন- ‘আমি কি ওকে ঠিকভাবে বড় করছি?’ আত্মীয়-স্বজনেরাও বলছে- ‘বাচ্চাটা বাবা/মায়ের জেদ পেয়েছে!’
এই অবস্থাটার নাম হয়ে গেছে ‘টেরিবল টু’ বা ‘ভয়ংকর-২’। কিন্তু সত্যিটা হলো, দুই বছর বয়স মানেই ভয়ংকর নয়। ভয়ংকর হলো এই সময়টাকে ভুলভাবে বোঝা এবং উপস্থাপন করায়।
Terrible Two- এই বয়সটায় শিশু যা করে তা ওর কোনো আচরণগত সমস্যা নয় বা শিশু ইচ্ছে করেও এমন অবাধ্যতা করে না। এটা ওর স্বাভাবিক বিকাশের একটা পর্যায়।
শিশুর ১৮-৩০ মাস বয়স একটি স্বাভাবিক বিকাশগত ধাপ, যখন শিশু প্রথমবারের মতো ‘আমি’-র অস্তিত্ব টের পায়।
এই সময় শিশুরা বারবার ‘না’ বলে, নিজের মতো করে সব করতে চায়, বলতে চায়; হঠাৎ আবেগে ভেঙে পড়ে কাঁদতে থাকে। ছোট ঘটনায় বড় প্রতিক্রিয়া দেখায়। এগুলো কিন্তু কোনো সমস্যা নয়, বরং ওর বড় হয়ে ওঠার লক্ষণ।
দুই বছরের শিশুকে বুঝতে হলে আগে জানতে হবে, শিশুর ব্রেনের বিকাশ নিয়ে।
আপনি যখন ভাবছেন, “ও ইচ্ছা করেই এমন করছে”, তখন শিশুর ব্রেনে চলছে এক বিশাল নির্মাণকাজ।
দুই বছর বয়সে শিশুর ব্রেনের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, অর্থাৎ যে অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে তা ভালোমতো তৈরি-ই হয় নি। কিন্তু আবেগের কেন্দ্র লিম্বিক সিস্টেম কাজ করছে পুরো শক্তিতে।
এর মানে কী? এর মানে হলো শিশু অনুভব করছে অনেক কিছু, কিন্তু সামলাতে পারছে না বা বোঝাতে পারছে না তার কিছুই।
আপনি ভাবছেন, আমার শিশু অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। আমার কথা শুনছে না, মানছে না। কিন্তু এই বয়সে ‘না’ মানেই অবাধ্যতা নয়। ‘না’ মানে আমি স্বতন্ত্র! আমার পছন্দ-অপছন্দ আছে, আমি সিদ্ধান্ত নিতে চাই, আমি আমার কথা বলতে চাই!
শিশু আপনাকে এই কথাটাই বোঝাতে চায় চিৎকার করে, কেঁদে, মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে এবং কখনো কখনো অভিমান ভরা চোখের টলমল পানি দিয়ে।
আপনি যদি এই ‘না’-কে দমন করেন, শাসন করেন, মারেন তাহলে আপনি আসলে সবচেয়ে বড় ভুলটাই করবেন। অর্থাৎ শিশুর আত্মপরিচয়ের চর্চাটাকেই আপনি থামিয়ে দেবেন।
মেঝেতে শুয়ে পড়া, চিৎকার, কান্না—এগুলো কিন্তু শিশুর অভিনয় নয়। এটি শিশুর আবেগ সামলাতে না পারার ফল।
ট্যানট্রাম, মানে খামখেয়ালি রাগের প্রকাশ, হঠাৎ প্রচণ্ড রাগ দেখানো, বা রাগের বশে চিৎকার-চেঁচামেচি করা- এগুলো বেশি হয় যখন শিশু ক্লান্ত বা ক্ষুধার্ত থাকে, রুটিন মিস হয়, অতিরিক্ত স্ক্রিন বা শব্দ থাকে তখন সে নিজেকে বোঝাতে পারে না।
তাই এই সময় শাস্তি নয়, দরকার সহযোগিতা আদর ভালবাসা মমতা। কিন্তু তা না করে যদি শিশুকে বকাবকি করেন, ভয় দেখান, মারধর করেন তখন আপনি আসলে তার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপটিকেই নষ্ট করে ফেলছেন।
বিজ্ঞান বলে, ভয় শিশুকে চুপ করাতে পারে, কিন্তু শেখাতে পারে না। তাই
আপনার প্রশান্তি শিশুর আবেগকে শান্ত হতে শেখায়। তাই ট্যানট্রামের সময় তার অনুভূতির নাম দিন। তাকে মমতার স্বরে বলুন “তুমি জেদ করছ, কারণ তুমি মায়ের কোলে বসতে চেয়েছ তা-ই?” কিংবা “তোমার ক্ষুধা লেগেছে, তাই চিৎকার করছ”?
দেখবেন, কিছুদিন তাকে বিষয়গুলো ধরিয়ে দিলেই সে নিজের আবেগ প্রকাশ করা শিখে যাবে।
শিশুর ঘুম ও খাবারের রুটিন ঠিক রাখুন। একই সময়ে ঘুম ও খাবারের অভ্যাস গড়ে তুলুন। স্ক্রিন টাইম নিজে কমান এবং প্রতিদিন শিশুর হাতেও ২০ মিনিটের বেশি স্মার্টফোন/আইপ্যাড রাখবেন না। কারণ এটা শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দেয়।
অনেক প্যারেন্টেরই এই প্রশ্নটা আছে, Terrible Two না হলে অর্থাৎ একেবারে জেদ বা আবেগ না দেখালে করণীয় কী?
করণীয় হলো, এই সময়টাতে শিশুকে আপনার নজরে রাখা। প্রয়োজনের চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ আবেগ চেপে রাখা সুস্থ বিকাশের লক্ষণ নয়।
দিনশেষে আজ আপনি যদি ধৈর্য ধরেন, বুঝতে শেখেন তাহলে এই ‘ভয়ংকর দুই’-ই একদিন গড়ে দেবে এমন মানুষ, যে নিজের অনুভূতি বুঝতে জানে এবং অন্যের প্রতিও সহনশীল ও সমমর্মী।
মনে রাখবেন ভয়ংকর নয়, এই সময়টা আসলে শিশুর ভালো মানুষ হয়ে ওঠার শুরু।