
published : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছয় বছরের শিশু জিহান। রাতে খেতে বসে প্লেটে খাবার মাখতে মাখতে বারবার তাকাচ্ছে বাবা-মায়ের দিকে। দুজনই ব্যস্ত ফোন স্ক্রলিংয়ে।
“বাবা! জানো, আজ স্কুলে আমি গ্রামীণ দৃশ্য এঁকেছি”
“বাহ, ভালো তো!”
“মা, আজ ক্লাসের দুষ্টু ছেলেটা আমাকে থুতু দিয়েছে”
“তাই! আগে তুমি কিছু করো নি তো?”
কথা চলছে, কিন্তু বাবা-মায়ের চোখ ফোন থেকে উঠছে না। তাদের থেকে মনোযোগ না পেয়ে একটা সময় জিহান চুপ হয়ে যায়। রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবে, “বাবা-মা কি আমাকে আর আগের মতো ভালবাসে না?”
ছোট্ট প্রশ্ন! কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে যথাযথ সন্তান লালনের পথে একটি বড় অন্তরায়— প্যারেন্টাল ফাবিং।
Phubbing শব্দটি এসেছে Phone এবং Snubbing (উপেক্ষা করা)—দুটো শব্দের সংমিশ্রণ থেকে। অর্থ করলে দাঁড়ায়- ফোনে মনোযোগ দিতে গিয়ে সামনে থাকা মানুষটিকে উপেক্ষা করা।
যখন বাবা-মা সন্তানের সামনে থেকেও স্মার্টফোনে ডুবে থাকেন, সন্তানের কথা, আবেগ বা উপস্থিতিকে গুরুত্ব দেন না তখন তাদের বলা হয় ফাবিং প্যারেন্টস এবং কাজটিকে বলা হয় প্যারেন্টাল ফাবিং।
প্যারেন্টাল ফাবিং হলো সন্তানের সাথে মানসিক উপস্থিতি না থাকার প্রমাণ। যা তার ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন।
মনোবিজ্ঞানী John Bowlby-এর Attachment Theory অনুযায়ী, শিশুর নিরাপদ মানসিক বিকাশের জন্যে প্রয়োজন responsive parenting—অর্থাৎ শিশুর ডাকে সাড়া দেয়া, চোখে চোখ রেখে কথা বলা, তার আবেগ বোঝা ও সেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানো।
প্যারেন্টাল ফাবিংয়ে এই স্বাভাবিক সংযুক্তিটিই ব্যাহত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মা শিশুকে উপেক্ষা করে ফোনে মনোযোগ দিলে তার মধ্যে insecure attachment তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। কারণ শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখার প্রথম পাঠ আসে বাবা-মায়ের কাছ থেকে। কিন্তু যখন তারা শারীরিকভাবে কাছে থেকেও মানসিকভাবে থাকেন অনুপস্থিত, তখন শিশুর মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। যার দরুণ শিশু তেতে থাকে, মনোযোগের ঘাটতি, হতাশা বা একাকীত্বে ভুগতে থাকে।
চীনে ৫০ সহস্রাধিক শিশুকে নিয়ে করা ৪২টি গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে— বাবা-মায়ের ফাবিং শিশুকে নিজের সমস্যাগুলো নিজের ভেতর চেপে রাখতে বাধ্য করে। অপরদিকে, রাগ জেদ বা আচরণগত সমস্যার প্রকাশ বাড়ায় এবং সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতাকে দুর্বল করে দেয়।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের ফাবিং কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি রিস্ক ফ্যাক্টর। ফাবিং যত বেশি, পারিবারিক বন্ধন তত দুর্বল এবং পরিণামে তত বেশি তাদের বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি।
ফাবিং শিশুদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আক্রমণাত্মক আচরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে উঠে এসেছে অন্য একটি গবেষণায়।
প্যারেন্টাল ফাবিংয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো- এটি শব্দহীন। এতে গালাগালি, চিৎকার, মারধর কিছুই নেই। কিন্তু আঘাতটা লাগে শিশুর মননে-হৃদয়ে-আত্মসম্মানে। সে অনুভব করতে শেখে- “আমি গুরুত্বপূর্ণ নই! আমার কথা শোনার কেউ নেই, বাবা-মা আমার চেয়েও বেশি ভালবাসে হাতের ডিভাইসকে!”
এই ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়েই সে বড় হয় এবং পরবর্তীতে নিজেও অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভর হয়ে পড়ে learned behavior হিসেবে।
অর্থাৎ, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার শুধু বর্তমান নয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ আচরণও গড়ে দিচ্ছে।
বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে এটা শুধু অবহেলা নয়; এর পেছনেও মনোবৈজ্ঞানিক কারণও আছে। যেমন-
কারণ যাই হোক, সন্তানের মানসিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এই অভ্যাস এবং প্রিয় বাবা-মা, এর দায়ভার কিন্তু নিতে হবে আপনাকেই!
১. ফোন-ফ্রি টাইম
পেশাগত বা সাংসারিক কাজের পর ফ্রি সময়ে ফোনকে নয়, বন্ধু বানান সন্তানকে। ফোনটাকে সরিয়ে রেখে তার সাথে সময় কাটান—খাওয়া, গল্প, খেলা, ড্রয়িং, বাগান করা, সাইক্লিং ইত্যাদির মাধ্যমে।
২. দৃষ্টি রাখুন ও মনোযোগ দিয়ে শুনুন
শিশু যখন আপনার সাথে কথা বলবে তখন তার চোখে চোখ রাখুন। তার প্রতিটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাকে এমন বোধ দিন যে- এই মুহূর্তটা শুধুই তার জন্যে।
৩. মেডিটেশন করুন
সন্তানকে সাথে নিয়ে দিনে অন্তত এক বেলা মেডিটেশন করুন। তাকে কোনো একটি অটোসাজেশন শিখিয়ে সেটার চর্চা করুন। এতে আপনার সাথে শিশুর মানসিক সম্পর্ক উন্নত হবে।
শুদ্ধাচার বই পড়ে শোনান অথবা তাকে পড়তে বলুন। এতে দুজনই শিখতে পারবেন, শেখাতে পারবেন।
৪. নিজেই হোন শিশুর রোল মডেল
শিশু যা দেখে, সেটাই শেখে। আপনি যদি ফোনটাকে তার চেয়ে কম গুরুত্ব দেন তাহলে সেও তা-ই শিখবে। বুঝতে পারবে বাস্তব সম্পর্কের মূল্য।
তাই আপনি আজ থেকে সেসব কাজই করুন যা সন্তানের মধ্যে দেখতে চান।
আসলে ফাবিং প্যারেন্টস মানেই খারাপ বাবা-মা নয়। কিন্তু সচেতন না হলে ভালবাসা আদর যত্ন মমতা থাকা সত্ত্বেও সন্তানের মনে শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
এই মুহূর্তে হয়তো আপনার ফোনে একটা নোটিফিকেশন জরুরি। কিন্তু সন্তানের চোখে যে প্রশ্ন, “আমি কি তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?” এর জবাব যদি নীরবতা হয় তো সেই ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না কোনো প্রযুক্তি কিংবা ডিজিটাল যোগাযোগ।