
published : ৯ মে ২০২৬
দেশে ধনী-গরিবের যে ব্যবধান বিগত কয়েক দশক ধরে বাড়ছিল, ২০২২ সাল থেকে তা রূপ নিয়েছে চরমে। Gini Co-efficient হলো ধনবৈষম্য পরিমাপের ইকনোমিক টুল। কোনো দেশের Gini Co-efficient ০.২৫-০.৩৫ এর মধ্যে থাকাটা আদর্শ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি প্রায় ০.৫০! এর অর্থ হলো, ধনীরা অনেক বেশি সম্পদ গড়েছে। সে তুলনায় গরিবদের সম্পদ বেড়েছে অল্পই। পরিণামে গুটিকতেক মানুষের হাতে পুঞ্জিভূত হয়েছে সম্পদের বড় অংশ, তৈরি হয়েছে ধনী ও গরিবদের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান।
হিজরতের সময়টাতে আনসার (মদিনাবাসী) ও মুহাজিরদের (মক্কা থেকে আগত হিজরতকারী) মধ্যে ছিল সম্পদের বিপুল ব্যবধান। মদিনায় ঈদুল আজহা পালন শুরু হয় ১ম হিজরিতে। এর ৫-৭ বছরের মধ্যে সেখানে ধনবৈষম্য অনেকখানি কমে আসে। কারণ যাকাত ও কোরবানির গোশতের যথাযথ বণ্টনের ফলে ধনীদের সম্পদ বাড়ার সাথে সাথে গরিবদের সম্পদও অনেকখানি বেড়ে তৈরি হয়েছিল সম্পদের ভারসাম্য।
দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব হয়ে ওঠে সুস্পষ্ট। মদিনায় গরিবদের একদিকে বাড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সক্ষমতা, অন্যদিকে বাড়ে সঞ্চয়। আগে কেবল ধনীরাই কিনতে পারত এমন পণ্যও কেনার সামর্থ্য তৈরি হয় তাদের।
গতবছর (২০২৫) সারাদেশে ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি হয়েছে ৯১ লক্ষ ৩৬ হাজার। যার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৭ লাখ। বাকিটা ছাগল ভেড়া উট দুম্বা।
একেকটি গরু-মহিষ থেকে গড়ে তিন মণ বা ১২০ কেজি ধরলে ৪৭ লাখ গরু থেকে পাওয়া যাবে প্রায় ৫৬ কোটি কেজি গোশত। বাকি পশু থেকে যদি ৫ কোটি কেজি গোশতও পাওয়া যাবে তাহলে মোট গোশত হবে ৬১ কোটি কেজি। ১৭ কোটি মানুষের মাথাপিছু সাড়ে ৩ কেজি আর ৪ সদস্যের একটি পরিবারের ১৪ কেজি গোশত পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।
বিশেষত শহরাঞ্চলে পশু কোরবানির পর একই বিল্ডিংয়ে থাকা পরিবারগুলোর বাইরে পার্শ্ববর্তী ভবনে থাকা প্রতিবেশীদের মধ্যে গোশত বিতরণের চল কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমনটা হয়- বেঁচে যাওয়া বিতরণের গোশত দারোয়ানের কাছে রেখে আসা হলো, তার প্রতি নির্দেশনা- কেউ গোশত চাইতে এলে তাকে গোশত দিয়ে দেয়া। এতে দ্বারা দ্বারে চাইতে আসা মানুষ অনেক গোশত পায়, আর যারা লোকলজ্জায় চাইতে পারে না তারা পায় না মোটেই।
কেউ কেউ গোশত ৩ ভাগ করে ১ ভাগ বিতরণ করে, আর ২ ভাগ নিজেরা রেখে দেয়। কেউ আবার দুটো গরু/ছাগল কোরবানি করে একটা বিতরণ করে, একটা নিজেদের জন্যে রাখে।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন বণ্টনব্যবস্থার এই ত্রুটিই সংশোধন করতে চায় কোরবানির সামাজিকায়নের মাধ্যমে। যা অবদান রাখবে ধনী-গরিবের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণেও।
আসলে সবকিছু গণিতের ফর্মুলা দিয়ে চলে না। আল্লাহর রহমত-বরকত এমনই একটা জিনিস।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-
কোরবানির পশুকে আল্লাহ তাঁর মহিমার প্রতীক করেছেন। তোমাদের জন্যে এতে রয়েছে বিপুল কল্যাণ। অতএব এগুলোকে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় এদের জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। এরপর এরা যখন জমিনে লুটিয়ে পড়ে, তখন তা থেকে (মাংস সংগ্রহ করে) তোমরা খাও এবং কেউ চাক না চাক সবাইকে খাওয়াও - সূরা হজ, আয়াত ৩৬
কোরবানির পশুর মধ্যে আল্লাহ বিপুল কল্যাণ রেখেছেন। এই ‘কল্যাণ’ হতে পারে কোরবানিদাতা ও কোরবানির গোশতগ্রহীতা উভয়েরই। এর প্রমাণ আমরা হাতেনাতেই পেয়েছি।
বান্দরবানের লামায় কোয়ান্টামমে আমরা ২০০২ সালে প্রথম যখন পশু কোরবানি করে অঞ্চলের সবার মধ্যে গোশত বিতরণ শুরু করি, তখন জায়গাটিতে ছিল চরম দারিদ্র। নিজেরা কোরবানি দেয়া তো দূর, গোশত কিনে খাওয়ার সামর্থ্যও ছিল না বেশিরভাগ মানুষের। এমন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও আমরা পেয়েছি, যারা মাংস পেয়ে কেঁদে ফেলেছিল। কারণ জীবনের অতগুলো বছরেও তাদের মাংস খাওয়া হয় নি।
সেই অবহেলিত হতদরিদ্র জনপদটিরই কী অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটল মাত্র ৯ বছরে! ২০১০ সালে আমরা সর্বশেষ লামা কোরবানি যখন করি ততদিনে সেখানকার দৃশ্যপটই বদলে গেছে। নিজেরাই পশু কোরবানি দেন- এমন সামর্থ্য তৈরি হয়েছে অনেকের। আর্থিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। ছন-বাঁশ-চাটাইয়ের ঘরের জায়গায় পাকা বাড়ি উঠেছে। অনেক দোকানপাট হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসা করতে আসছে মানুষজন। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিস পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি জুয়েলারি শপ পর্যন্ত হয়েছে।
নবীজী (স) ও সাহাবীরা কোরবানি করে নিজ হাতে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের কাছে গোশত পৌঁছে দিতেন। গরিবদের ডেকে সম্মানের সাথে খাওয়াতেন। এভাবে সৃষ্টি হতো সামাজিক সমমর্মিতা। যেটার অভাব এখনকার সমাজব্যবস্থায় প্রকট।
এখন গরিবদের সম্মানের সাথে গোশত খাওয়ানো হয় না। বিতরণ করা হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই সম্মানের সাথে না, বঞ্চনা ও অবহেলার সাথে। দেখা যায় পলিথিন বা কলাপাতায় মুড়ে গোশতের খারাপ অংশগুলো বিতরণ করা হচ্ছে গরিবদের মধ্যে। মুখে না বললেও বঞ্চনাটা তারা ঠিকই অনুভব করেন। ফলে যে কোরবানি হতে পারত ধনী ও গরিবদের মধ্যে বিভেদ মোচনের মাধ্যম, সেই কোরবানির গোশত বিতরণ থেকেও সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে ব্যবধান।
যা শুরু হয় ২০২৪ সাল থেকে। সেবছর কোয়ান্টাম সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের সম্মিলিত অর্থে পশু কিনে কোরবানি করা হয়। মোট ১১৭টি গরু এবং ৯৯টি ছাগল কোরবানি করে ৯,৭১৫টি পরিবারে গোশত বিতরণ করা হয়, রান্না করে আপ্যায়ন করা হয় ৬ সহস্রাধিক জনকে।
২০২৫ সালে কার্যক্রমের পরিধি আরো বাড়ে। কোরবানি দেয়া হয় ১৬৩টি গরু এবং ১৪১টি ছাগল। মোট ৩২,০৪৮ কেজি গোশত বিতরণ করা হয় ১৯,৫১৫টি পরিবারের মধ্যে। আর রান্না করে গোশত আপ্যায়ন করা হয় ৮ সহস্রাধিক জনকে।
শুধু সম্মানের সাথে রান্না করা গোশত খাওয়ানোই না, গোশত বিতরণেও থাকে সম্মান ও যত্নের ছাপ। সুন্দরভাবে বক্সে গোশত ভরে কাপড়ের ব্যাগে করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হয় মমতার সাথে। ধনী-গরিব ভেদে ভিন্নতা করা হয় না গোশতের পরিমাণ ও প্যাকেজিংয়ে। এতে গরিবরা সম্মানিত বোধ করেন নিজেদের, কোরবানি হয়ে ওঠে ধনী ও গরিব দুই শ্রেণীর মানুষের জন্যেই আনন্দের উপলক্ষ।
এবছর আমাদের লক্ষ্য অন্তত ৩০ হাজার পরিবারের মধ্যে গোশত বিতরণ। প্রতি ভাগ ২১,০০০ টাকা হিসেবে এক বা একাধিক ভাগের অর্থ দিয়ে অংশ নিন এ বিশাল সৎকর্মে। কোরবানির টাকা জমা দিতে পারেন-
কোরবানিতে নাম দেয়ার পাশাপাশি আপনি নির্দিষ্ট কারো কাছে গোশত পৌঁছাতে চাইলে তার নাম-ঠিকানাও জমা দিতে পারেন। আমরা আপনার পক্ষ থেকে কোরবানির গোশত পৌঁছে দেবো তার কাছে।